আর্কিটেকচারে নিত্য নতুন সফটওয়্যার

আর্কিটেকচারে নিত্য নতুন সফটওয়্যার শফিক রাহ্‌মান   Published: 23rd January, 2015.  The Daily Ittafeq, Dhaka.


স্থাপত্য বর্তমানে বাংলাদেশের একটি অন্যতম পেশা। স্থাপত্যে পড়াশোনা নবীন দের অন্যতম আকর্ষণ। অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখন স্থাপত্তে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন এসে যায় আমদের স্থাপত্য চর্চা কতটুকু আধুনিক। আন্তর্জাতিক মানের সাথে প্রযুক্তিগত ভাবে আমরা কতটুকু এগিয়েছি?

উন্নত দেশ গুলোর থেকে আমাদের দেশ এর স্থাপত্য চর্চা বা স্থাপত্যে পড়াশোনা খুব বেশি পিছয়ে নেই।  পৃথিবীর নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষার মান আর বাংলাদেশের স্থাপত্য শিক্ষার মান সমমানের। কিন্তু একটি জায়গায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি, আর তা হল স্থাপত্যে প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার এর ব্যবহার। এখুনি প্রয়োজন আমাদের স্থাপত্যের শিক্ষার্থী দের আরও দক্ষ আরও অগ্রসর প্রযুক্তি গ্রহন করা, নয়তো প্রতিযোগিতায় পিছয়ে পরবো আমরা। এই প্রবন্ধে একজন স্থপতির অথবা স্থাপত্যের শিক্ষার্থীর কাজের পরিসর অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও যুগউপযগি কিছু সফটওয়্যার এর ব্যবহার তুলে ধরা হল।

  Ecotect, Autodesk Project Vasari এবং Climate Consultant

ডিজাইন প্রক্রিয়ার শুরুতেই আসে সাইট এনালাইসিস, সাইট এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। আমাদের দেশের প্রচলিত ধারা হল দিক নির্ণয় এবং আনুমানিক সূর্যের গতিপথ অথবা আনুমানিক বাতাসের প্রবাহের দিক হাতে আঁকিয়ে নির্ধারণ করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া মটেই বাস্তব সম্মত নয়। কারন একটি সাইট এর পারিপার্শ্বিক কাঠামোর কারনে সাইট এর আবহাওয়া গত বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। উধারন হিসেবে বলা যায় বাতাসের প্রবাহের কথা। একটি সাইট এর পার্শ্ববর্তী কাঠামোর অবস্থান আকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে বাতাস প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা কখনই ধারনা নির্ভর বা ওই এলাকার সাধারন আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য কে অনুসরণ করেনা। এই ক্ষেত্রে দুটি সহজ সফটওয়্যার এর ব্যবহার আমাদের সম্পূর্ণ নিখুত আবহাওয়া গত বৈশিষ্ট্য নিরধারন করতে সহায়তা করতে পারে।  প্রথমেই বলি Ecotect এর কথা। যেকোনো 3d মডেলিং সফটওয়্যার এ সাইট সহ এর পারিপার্শ্বিক কাঠামো গুলোর একটি মডেলিং তৈরি করে Ecotect এর মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বছরের বিভিন্ন সময়ের সানপাথ ডায়াগ্রম, পারিপার্শ্বিক ভবন এর ছায়া সহ নিখুত পর্যবেক্ষণ করে ফেলা সম্ভব অতি সহজেই। একি ভাবে বাতাসের প্রবাহ আর পারিপার্শ্বিক অবকাঠামোর অবস্থান অনুযায়ী বাতাসের দিক পরিবর্তন আর প্রবাহের বৈশিষ্ট্য সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে ব্যবহার করা যায় Autodesk Project Vasary । এই সফটওয়্যার টির মাধ্যমে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে বাতাসের গতিপথ। একটি সাইট এর নিথুত পর্যবেক্ষণ প্রোজেক্টটির  এর ডিজাইন এর ধারা কে কি পরিমান প্রভাবিত করতে পারে তা পেশাজীবী স্থাপতি দের অযানা নয়।

  3ds Max এবং sketchup

বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত এই দুটি সফটওয়্যার মুলত প্রথমিক ডিজাইন, স্থাপতিক ভাষায় conceptual design এবং primary form এর অনুশিলনের জন্য সারা বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন পরবর্তী ভিজুয়ালাইজেসন এ এই সফটওয়্যার গুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু বিল্ডিং ভিজুয়ালাইজেসন কে এখন আর আলাদা কোন ভাগ হিসেবে দেখা হয়না, সঠিক ডিজাইন সফটওয়্যার এর ব্যবহার একি সাথে বিল্ডিং এর প্লান, সেকশন, এলিভেশন এবং ভিজুয়ালাইজেসন সহ সব কিছু স্বয়ংক্রিয় ভাবে তৈরি করে।

  Building Information Modeling (BIM) এবং Revit Architecture

Building Information Modeling সংক্ষেপে BIM, এটি বর্তমান বিশ্বের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডিজাইন টেকনোলজি। BIM একটি প্রক্রিয়া, BIM প্রযুক্তির অনেক সফটওয়্যার বর্তমানে বিশ্বে বহুল প্রচলিত। এর মাঝে বহুল ব্যবহৃত দুটি সফটওয়্যার হল Revit এবং Archicad.  বাংলাদেশ এ খুব সল্প পরিসরে ব্যবহৃত হয় এই সফটওয়্যার গুল। আমাদের দেশে সরবপরি পরিচিত ডিজাইন সফটওয়্যার হল AutoCAD, কিন্তু স্থাপত্য বা ইঞ্জিনিয়ারিং অনুশীলন এ AutoCAD একটি অত্যন্ত প্রাচীন সফটওয়্যার যা উন্নত বিশ্বে এখন আর ব্যবহৃত হয়না বললেই চলে। BIM সফটওয়্যার এ ডিজাইন এর মুল বৈশিষ্ট্য হল এটি একি সাথে পুরো ডিজাইন সিস্টেম টাকে তৈরি করে। উধারন হিসেবে বলা যায়, একটি ভবন এর প্লান আঁকালে এই সফটওয়্যার এ একি সাথে সব গুল এলিভেশন এবং 3d ভিজুয়ালাইজেসন তৈরি হয়ে যায়। যেকোনো পরিবর্তন সমগ্র ডিজাইন এ একি সাথে পরিবর্তন নিয়ে আসে। যেমন, একটি বহুতল ভবন ডিজাইন এর কথা ধরা যাক, ভবনটি ডিজাইন এর পরে স্থপতি এলিভেশন দেখে কিছু জানালা পরিবর্তন করতে চাইলেন, তিনি এলিভেশন এ ইচ্ছে মত পরিবর্তন করে দিলে সমগ্র প্লান এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয় ভাবে পরিবর্তিত হবে। বড় একটি প্রোজেক্ট এর নির্মাণ সঙ্ক্রান্ত ড্রয়িং বা working drawing করতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু BIM সফটওয়্যার এর মাধ্যমে ডিজাইন শেষ হবার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে working drawing তৈরি করে ফেলা যায়। BIM সফটওয়্যার এ একি সাথে রয়েছে ডিজাইন সংশ্লিষ্ট সকল ইঞ্জিনিয়ার এবং স্থপতি দের একসাথে কাজ করার সুযোগ। BIM সিস্টেম ডিজাইন প্রক্রিয়াকে এতটাই সহজ করেছে যে এতে ডিজাইন শেষ করার সাথে সাথে বিস্তারিত ভাবে সকল ডোর এবং উইন্ডো সিডিউলও তৈরি হয়ে যায়। এই শ্রেণীর সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনেক বড় মাপের একটি প্রোজেক্ট এর নিখুত ড্রয়িং এবং যাবটিও ডিটেলিং সম্পন্ন করা সম্ভব অতি অল্প সময়ে। আর ডিজাইন একটি প্রক্রিয়া যা প্রতিনিওত পরিবর্তন হতে পারে, BIM সফটওয়্যার এ যেকোনো পরিবর্তন করা যায় মুহূর্তের মধ্যে, যা সমগ্র ডিজাইন এ স্বয়ংক্রিয় ভাবে পরিবর্তন করে দেয়। তাই বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি উন্নত প্রতিষ্ঠান এখন BIM সফটওয়্যার এ ডিজাইন, ড্রাফটিং এবং যাবতীয় নির্মাণ সঙ্ক্রান্ত ড্রয়িং করে থাকে। এই সফটওয়ার গুলতে দক্ষতা অর্জন নবীন স্থপতি দের জন্য সারা বিশ্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ এনে দিবে অতি সহজেই।

Rhinoceros 3D এবং Grasshopper

অনেক নবীন স্থপতি সপ্ন দেখে অনেক বেশী সৃষ্টিশীল অনেক বেশী বাতিক্রম ডিজাইন করার। অনেকের সপ্ন রয়েছে যাহাদিদ বা ফ্রাঙ্ক গেরির মত স্থাপনা নির্মাণের অথবা এমন বিসস্ময়কর স্থাপত্য নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হবার। London Aquatics Centre বা Bridge Pavilion এর মত বিসস্ময়কর স্থাপত্য গুলো কিভাবে ডিজাইন হয়, কিভাবেই বা সাইট এ তৈরি হয় এই সব জটিল স্থাপনা! উল্লেখ্য যে এই সব বিস্ময় জাগানো প্রোজেক্ট গুলো কিন্তু সম্পূর্ণ জিওমেট্রিক ফরমুলা অনুসুরন করে তৈরি হচ্ছে। ইচ্ছে নির্ভর বা আবেগ নির্ভর নয়, বরং অঙ্কের সমিকরন মেনে বিভিন্ন জটিল সূত্র অনুসরণ করে ডিজাইন করা হয়েছে এইসব স্থাপনা। আর এই ধরনের ডিকন্সট্রাকটিভ অথবা স্মুথ কার্ভ ফর্ম ডিজাইন করার জন্য রয়েছে বেশকিছু সফটওয়্যার, যারমধ্যে বহুল পরিচিত হল Rhinoceros 3D এবং Grasshopper. একান্ত প্রচেষ্টা করলে খুব অল্প সময়ে এই সফটওয়্যার গুলতে দক্ষতা অর্জন সম্ভব। একি সাথে খুলে যাবে বিশ্বখ্যাত স্থাপতিক প্রতিষ্ঠান গুলতে কাজ করার সুযোগ।

Design Builder

যে সকল স্থপতি কাজ করছেন এনাজি (Energy) ম্যানেজমেন্ট বা সাসটেনিবিলিটি নিয়ে, তাদের কাজ এর পরিসর কে গুছিয়ে বাস্তবতায় রুপ দিতে সাহায্য করবে Design Builder নামের এই অত্যাধুনিক সফটওয়্যার টি। উধাহরন হিসেবে বলা যায়, একটি বিল্ডিং নির্মাণ এর আগেই ভবনটির ভিতরের তাপমাত্রা নির্ণয় করবে এই সফটওয়্যার। প্রতিটি স্পেস এর এনাজি (Energy)  বিশ্লেষণ করে ঠিক করতে পারবেন প্রয়োজনীয় গ্লাস বা মেটেরিয়াল, যা পুনরাই বিশ্লেষণ করে করে ডিজাইনার কে জানিয়ে দিবে বর্তমান অভ্যন্তরীণ অবস্থা, নির্ধারণ করা যাবে প্রয়োজনীয় শেডিং ডিভাইস, লুভার। নির্ধারণ করতে পারবেন প্রয়োজনীয় লাইটিং সিস্টেম। সারাবছরের এনাজি (Energy) ব্যবহার এর পরিমান জানা যাবে নির্মাণের আগেই। রি-ডিজাইন করে কমিয়ে আনা যাবে এনাজি (Energy) ব্যবহার এবং সরবপরি সাসটেনিবিলিটি নিয়ে অসাধারণ কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে এই সফটওয়্যারটি।

বর্তমান পৃথিবী কি প্রচণ্ড প্রগতিশীল তার উদাহরন আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা থেকেই প্রতিনয়ত উপলব্ধি করা যায়। আশির দশক এর যে ছেলেটি স্কুল জীবনে ক্যাসেট প্লেয়ার এ গান শুনতো, সেই ছেলেটিই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে পকেট এ রাখা ছোট্ট আইপড এ হাজার হাজার গান নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিবর্তন যেমন এসেছে প্রত্ত্যহিক জীবনে, ঠিক তেমনি বিবর্তন হয়ে গেছে প্রযুক্তিগত। তাই বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেমন প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন আমাদের নবীন শিক্ষার্থী দের একান্ত প্রচেষ্টা এবং আকাশ স্পর্শ করার স্বপ্ন।